ঢাকা , সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo জয়পুরহাটে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি, থানায় জিডি Logo ‎ফরিদপুরে গুজব ছড়িয়ে ট্রাক চালককে হত্যা গ্রেফতার ১ Logo রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কাজুবাদাম চাষে মিলেছে সফলতা Logo অটোমেশন সিস্টেমে আধুনিক হচ্ছে ভূমি সেবা কার্যক্রম, কমছে ভোগান্তি ও দালাল Logo ঢাকার জরুরি পানি সরবরাহ জোরদারে ৯২০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার Logo বন্ধ থাকা ৬ শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালু করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ: প্রধানমন্ত্রীর Logo প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় পিএইচডি ফেলোশিপে আবেদন কার্যক্রম শুরু Logo পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে নৌ ও সড়ক খাতে সমন্বয়ের তাগিদ: সেতুমন্ত্রীর Logo বিশ্বকাপের সম্প্রচার নিয়ে স্বস্তির খবর এলো দেশের ফুটবলভক্তদের জন্য Logo ভিন্ন রূপে আবারও পর্দায় আসছে ‘প্ল্যানেট অব দ্য এপস’
নোটিশ :
বাংলা 21 সংবাদ পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়ে আপনিও আপনার মতামত, পরামর্শ অথবা অভিযোগ আমাদের জানাতে পারেন।

অটোমেশন সিস্টেমে আধুনিক হচ্ছে ভূমি সেবা কার্যক্রম, কমছে ভোগান্তি ও দালাল

জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা সাধারণ মানুষের জন্য একসময় সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া ছিল।

কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হত। দীর্ঘসূত্রতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য মানুষের ভোগান্তিকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিত। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে মুঠোফোনেই পাওয়া যাচ্ছে অধিকাংশ ভূমি সেবা। ফলে দুর্নীতি কমছে, বাড়ছে স্বচ্ছতা; নাগরিক জীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী বাসস’কে বলেন, অটোমেশনের ফলে জনগণকে ভূমি সেবার পেতে এখন আর সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসে বা অনলাইনেই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এতে দুর্নীতি যেমন কমেছে, সেবা প্রাপ্তিও সহজতর হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তবে এক্ষেত্রে মানুষজনকেও আরও সচেতন হতে হবে। নয়তো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো কঠিন হবে।

সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) গত কয়েক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-নামজারি নিষ্পত্তি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই, সবকিছুই এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল ভূমি সেবা চালুর ফলে শুধু সময় ও খরচই কমেনি, বরং সেবার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দুর্নীতির সুযোগ কমেছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

 

ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ: 

আগে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার যাতায়াত করতে হত। এতে সময় ও অর্থ, উভয়ের অপচয় হত। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই কর পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ই-পর্চা ও ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর প্রতিবছরই অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন।

এসব করদাতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন। তারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করছেন। ফলে ভূমি অফিসে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বাসস’কে বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো একটা দিন লেগে যেত। এখন মোবাইলে কয়েক মিনিটে কাজ হয়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে রসিদও পাওয়া যাচ্ছে।

 

অনলাইনে নামজারিতে কমছে দালাল নির্ভরতা: 

জমি কেনাবেচার পর মালিকানার প্রমাণপত্র পুনর্নির্ধারণ করতে যেতে হয় নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়ায়। এটি আগে ছিল সবচেয়ে জটিল ধাপগুলোর একটি। আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হতেন এবং বাধ্য হয়ে সরকারি ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করতেন।

বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড এবং আবেদনের অগ্রগতি মোবাইল ফোনে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে এসএমএস নোটিফিকেশন চালু থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটিরও বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখের বেশি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বাসস’কে বলেন, অনলাইনে নামজারির আবেদন ভূমি সেবাগ্রহীতাদের সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি এসব আবেদন যেন দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা হয়, সে বিষয়ে প্রতিটি উপজেলার ভূমি সহকারী কমিশনারদের পর্যাপ্ত নির্দেশনা দেওয়া আছে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমির নামজারি করতে না পারলে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

 

খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ এখন হাতের নাগালে: 

ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুয়া কাগজপত্রের কারণে মানুষ প্রতারিত হত। এখন অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিমুল চক্রবর্তী বলেন, আগে জমি কেনার সময় কাগজ যাচাই করতে অনেক ঝামেলা হত। এখন অনলাইনে খতিয়ান মিলিয়ে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায় তথ্য সঠিক কি না।

 

দালালচক্রের দৌরাত্ম্য হ্রাস: 

একসময় ভূমি অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্র সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। তথ্যের অভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের সহায়তা নিতেন।

বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক সেবা চালুর ফলে সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমে গেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কারণে কোন কর্মকর্তা কতদিন ধরে একটি আবেদন আটকে রেখেছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে জবাবদিহিতা বেড়েছে।

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার শিক্ষক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগে মনে হত নামজারি করা খুব কঠিন। কিন্তু এবার অনলাইনে আবেদন করে সহজেই কাজ সম্পন্ন করেছি। কোনো দালালের প্রয়োজন হয়নি।

 

ডিজিটাল ডাটাবেজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: 

ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমবে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হ্রাস পাবে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং রাজস্ব বিভাগের তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হলে জমি কেনাবেচার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হালনাগাদ করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বাসস’কে বলেন, অটোমেশনের ফলে মানুষজন ভূমির যে সেবা পাচ্ছে, তার ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমে আসবে, পাশাপাশি জমি নিয়ে মামলাও কম হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

জয়পুরহাটে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি, থানায় জিডি

অটোমেশন সিস্টেমে আধুনিক হচ্ছে ভূমি সেবা কার্যক্রম, কমছে ভোগান্তি ও দালাল

আপডেট সময় ৩ ঘন্টা আগে

জমির খতিয়ান তোলা, নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা সাধারণ মানুষের জন্য একসময় সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া ছিল।

কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হত। দীর্ঘসূত্রতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য মানুষের ভোগান্তিকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিত। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে মুঠোফোনেই পাওয়া যাচ্ছে অধিকাংশ ভূমি সেবা। ফলে দুর্নীতি কমছে, বাড়ছে স্বচ্ছতা; নাগরিক জীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী বাসস’কে বলেন, অটোমেশনের ফলে জনগণকে ভূমি সেবার পেতে এখন আর সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসে বা অনলাইনেই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এতে দুর্নীতি যেমন কমেছে, সেবা প্রাপ্তিও সহজতর হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তবে এক্ষেত্রে মানুষজনকেও আরও সচেতন হতে হবে। নয়তো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো কঠিন হবে।

সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) গত কয়েক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-নামজারি নিষ্পত্তি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই, সবকিছুই এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল ভূমি সেবা চালুর ফলে শুধু সময় ও খরচই কমেনি, বরং সেবার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দুর্নীতির সুযোগ কমেছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

 

ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ: 

আগে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার যাতায়াত করতে হত। এতে সময় ও অর্থ, উভয়ের অপচয় হত। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই কর পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ই-পর্চা ও ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর প্রতিবছরই অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন।

এসব করদাতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন। তারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করছেন। ফলে ভূমি অফিসে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বাসস’কে বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো একটা দিন লেগে যেত। এখন মোবাইলে কয়েক মিনিটে কাজ হয়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে রসিদও পাওয়া যাচ্ছে।

 

অনলাইনে নামজারিতে কমছে দালাল নির্ভরতা: 

জমি কেনাবেচার পর মালিকানার প্রমাণপত্র পুনর্নির্ধারণ করতে যেতে হয় নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়ায়। এটি আগে ছিল সবচেয়ে জটিল ধাপগুলোর একটি। আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হতেন এবং বাধ্য হয়ে সরকারি ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করতেন।

বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড এবং আবেদনের অগ্রগতি মোবাইল ফোনে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে এসএমএস নোটিফিকেশন চালু থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটিরও বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখের বেশি আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বাসস’কে বলেন, অনলাইনে নামজারির আবেদন ভূমি সেবাগ্রহীতাদের সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি এসব আবেদন যেন দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা হয়, সে বিষয়ে প্রতিটি উপজেলার ভূমি সহকারী কমিশনারদের পর্যাপ্ত নির্দেশনা দেওয়া আছে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমির নামজারি করতে না পারলে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

 

খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ এখন হাতের নাগালে: 

ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুয়া কাগজপত্রের কারণে মানুষ প্রতারিত হত। এখন অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিমুল চক্রবর্তী বলেন, আগে জমি কেনার সময় কাগজ যাচাই করতে অনেক ঝামেলা হত। এখন অনলাইনে খতিয়ান মিলিয়ে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায় তথ্য সঠিক কি না।

 

দালালচক্রের দৌরাত্ম্য হ্রাস: 

একসময় ভূমি অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্র সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। তথ্যের অভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের সহায়তা নিতেন।

বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক সেবা চালুর ফলে সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমে গেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কারণে কোন কর্মকর্তা কতদিন ধরে একটি আবেদন আটকে রেখেছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে জবাবদিহিতা বেড়েছে।

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার শিক্ষক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগে মনে হত নামজারি করা খুব কঠিন। কিন্তু এবার অনলাইনে আবেদন করে সহজেই কাজ সম্পন্ন করেছি। কোনো দালালের প্রয়োজন হয়নি।

 

ডিজিটাল ডাটাবেজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: 

ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান এবং মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমবে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হ্রাস পাবে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্তকরণ, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং রাজস্ব বিভাগের তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হলে জমি কেনাবেচার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকানা হালনাগাদ করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বাসস’কে বলেন, অটোমেশনের ফলে মানুষজন ভূমির যে সেবা পাচ্ছে, তার ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কমে আসবে, পাশাপাশি জমি নিয়ে মামলাও কম হবে।