ঢাকা , বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
বাংলা 21 সংবাদ পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়ে আপনিও আপনার মতামত, পরামর্শ অথবা অভিযোগ আমাদের জানাতে পারেন।

পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ: আইনি কড়াকড়ি বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম পলিথিন। ২০০২ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তবে দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সেই নিষেধাজ্ঞার সুফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সুপারশপ ও কাঁচাবাজারে পলিথিন বর্জনে যে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল আইন প্রয়োগ করে কি এই শিকড় গেড়ে বসা অভ্যাস উপড়ানো সম্ভব?
পলিথিনের ভয়াবহতা এখন আর কেবল ড্রেন জ্যাম বা জলাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নদ-নদী হয়ে বছরে প্রায় ২৫ হাজার টন প্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে, যা আমাদের নীল অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানকে বিপন্ন করছে। আরও ভীতিজনক তথ্য হলো, আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করেছে। মাছের মাধ্যমে এই বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরে ঢুকছে, যা ক্যান্সারসহ নানাবিধ মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পলিথিন বর্জন অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সস্তা এবং সহজলভ্য বিকল্পের অভাব। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে বাজারে যে চটের বা কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম ও প্রাপ্যতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালে নেই। পলিথিন কারখানাগুলো বন্ধ করা এবং বিকল্প ব্যাগ উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানের উদ্ভাবিত পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’ এক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারত, কিন্তু বড় পরিসরে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সরকার ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পলিথিন নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ বর্জনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা একটি ভালো সূচনা। তবে এই সংগ্রাম সফল করতে হলে নজরদারি বাড়াতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে। বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, পলিথিন কেবল পরিবেশ নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যও ধ্বংস করছে।
পরিশেষে, পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভ ত্যাগ করা এবং সাধারণ ক্রেতাদের পলিথিনকে ‘না’ বলার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং টেকসই বিকল্পের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ তার হারানো ‘সবুজ শ্যামল’ রূপ ফিরে পেতে সক্ষম হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ: আইনি কড়াকড়ি বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় ০১:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম পলিথিন। ২০০২ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তবে দুই দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সেই নিষেধাজ্ঞার সুফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সুপারশপ ও কাঁচাবাজারে পলিথিন বর্জনে যে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল আইন প্রয়োগ করে কি এই শিকড় গেড়ে বসা অভ্যাস উপড়ানো সম্ভব?
পলিথিনের ভয়াবহতা এখন আর কেবল ড্রেন জ্যাম বা জলাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নদ-নদী হয়ে বছরে প্রায় ২৫ হাজার টন প্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে, যা আমাদের নীল অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানকে বিপন্ন করছে। আরও ভীতিজনক তথ্য হলো, আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করেছে। মাছের মাধ্যমে এই বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরে ঢুকছে, যা ক্যান্সারসহ নানাবিধ মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পলিথিন বর্জন অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সস্তা এবং সহজলভ্য বিকল্পের অভাব। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে বাজারে যে চটের বা কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম ও প্রাপ্যতা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালে নেই। পলিথিন কারখানাগুলো বন্ধ করা এবং বিকল্প ব্যাগ উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানের উদ্ভাবিত পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’ এক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারত, কিন্তু বড় পরিসরে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সরকার ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পলিথিন নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ বর্জনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা একটি ভালো সূচনা। তবে এই সংগ্রাম সফল করতে হলে নজরদারি বাড়াতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে। বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, পলিথিন কেবল পরিবেশ নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যও ধ্বংস করছে।
পরিশেষে, পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভ ত্যাগ করা এবং সাধারণ ক্রেতাদের পলিথিনকে ‘না’ বলার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং টেকসই বিকল্পের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ তার হারানো ‘সবুজ শ্যামল’ রূপ ফিরে পেতে সক্ষম হবে।