ফরিদপুরের সদরপুরে জমিজমা, বাড়িঘর ও বাগানের গাছ কাটা নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে ভাতিজাদের নির্মম হামলায় কাজী সিরাজুল হক ওরফে লাল মিয়া (৫৬) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় রানা কাজী (৩০) নামে আরও একজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
গত ২৯ মে শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে সদরপুর উপজেলার চর বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কাজীর ডাঙ্গী গ্রামে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত সিরাজুল হক ওই গ্রামের মৃত ইসমাইল কাজীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় সপরিবারে বসবাস করতেন এবং মানিকগঞ্জের বসুন্ধরা স্টিল মিলে কর্মরত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কাজী সিরাজুল হক করোনা মহামারির পর থেকে মূলত ঢাকাতেই অবস্থান করতেন এবং গ্রামে নিয়মিত যাতায়াত ছিল না। গত ঈদুল আজহার পরদিন তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। বাড়ির বাগানের গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া এবং জমিজমা নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
গত শুক্রবার বিকেলে সিরাজুল হক যখন পুনরায় ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই প্রতিপক্ষের লোকজন অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে সিরাজুল হকের চাচাতো ভাই রানা কাজীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। তাকে বাঁচাতে সিরাজুল হক এগিয়ে গেলে হামলাকারীরা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত রানা কাজী বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতের পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সুমন কাজী (৩৫), তুষার কাজী, তাদের মা ডলি বেগম (৫৫), সুমনের স্ত্রী মিথিলা (৩০) এবং তুষারের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার সুইটিসহ (২৫) আরও কয়েকজনকে সরাসরি দায়ী করেছেন। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছে।
নিহতের স্ত্রী সালমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন: ”ঈদের পরদিন সকালে আমার স্বামী গ্রামে যান এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। আমাদের বাগানের গাছ কাটা নিয়ে হয়তো বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। পরে ঢাকায় ফেরার পথে তারা আমার স্বামীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি এই খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও ফাঁসি চাই।”
আহত রানা কাজীর স্ত্রী হালিমা সুলতানাও তার স্বামীর ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। এছাড়া, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাতুড়িটি কামরুল কাজী নামের এক ব্যক্তির হেফাজতে রয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন।
এদিকে গতকাল ২ জুন মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম, ভাঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে পুলিশ সুপার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন।
পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গাছ কাটা ও জায়গাজমি নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার সাথে জড়িতরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সালমা আক্তার বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে সদরপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নং- ২৮/১৩১, তারিখ: ৩০/০৫/২০২৬ ইং)। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এসআই আসাদ।
এদিকে নিহত কাজী সিরাজুল হকের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে ফরিদপুরের আলীপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পত্তির লোভ ও সুষ্ঠু সমাধানের অভাবই এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।

সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের অভিযানে চাপাতিসহ ছিনতাইকারী গ্রেফতার
শফিউল মঞ্জুর ফরিদঃ 
















