ঢাকা , বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের অভিযানে চাপাতিসহ ছিনতাইকারী গ্রেফতার Logo জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ: স্পিকার Logo ‘টয় স্টোরি ৫’-এ গান গাইতে যাচ্ছেন টেইলর সুইফট Logo ফরিদপুরে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪৪ জন হামে আক্রান্ত, মোট মৃত্যু ২০ Logo ফরিদপুরের আলোচিত কণ্ঠশিল্পী লাইলি খাতুনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ Logo সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ Logo যাত্রাবাড়ী থানার অভিযানে গণধর্ষণ মামলার তিন আসামি গ্রেফতার Logo বিসিবি নির্বাচন নিয়ে জটিলতার অবসান, ৭ জুনই হচ্ছে ভোট Logo ফরিদপুরে ভাতিজাদের হাতুড়িপেটায় চাচা খুন: ঘটনাস্থলে এসপি Logo প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ
নোটিশ :
বাংলা 21 সংবাদ পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়ে আপনিও আপনার মতামত, পরামর্শ অথবা অভিযোগ আমাদের জানাতে পারেন।

সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ

আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ রূপান্তরের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি ক্রয়ে কোনো ধরনের অফলাইন বা ম্যানুয়াল (কাগজে-কলমে) দরপত্র আহ্বান করা যাবে না। দেশের ক্রয় খাত সংস্কারের যাত্রায় এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়া ১ জুলাই, ২০২৬ এর আগে ম্যানুয়ালি শুরু হলে সেই প্রক্রিয়ার বাকি ধাপগুলো ম্যানুয়ালি চলতে পারে। তবে ওই তারিখের পর নতুন কোনো অফলাইন টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুমোদিত হবে না। ই-জিপি ব্যবহার থেকে অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদনও ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পর আর অনুমোদিত হবে না।

 

তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

 

সরকারি ক্রয়: একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সুশাসনে সরকারি ক্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ সরকারি ক্রয়ে ব্যয় হয়। তাই জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং সেবা প্রদানের মান বাড়াতে এই খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।

ক্রয় ব্যবস্থাপনা জোরদার করার লক্ষ্যে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে, যা ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি, পিপিআর-২০০৮-এর পরিবর্তে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ক্রয় ব্যবস্থায় একটি ব্যাপক সংস্কার হয়েছে।

 

ই-জিপি: ক্রয় খাত সংস্কারের মেরুদণ্ড
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের অধীনে সবচেয়ে যুগান্তকারী সংস্কারগুলোর অন্যতম হলো সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রমে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত এই ই-জিপি ব্যবস্থা দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে চুক্তি সম্পাদন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া—অর্থাৎ সম্পূর্ণ ক্রয় চক্রকে ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাধ্যতামূলক ই-জিপি বাস্তবায়নের এই পদক্ষেপের ফলে ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতির দরপত্রের সাথে জড়িত দীর্ঘদিনের বহু সমস্যা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কাজের দীর্ঘসূত্রতা, স্বচ্ছতার অভাব, মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের সুযোগ।

 

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সংস্কারের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

 

প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি:
দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের গড় সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিআর, ২০২৫ বাস্তবায়নের আগে যেখানে দরপত্র প্রতি গড় দরদাতার সংখ্যা ছিল মাত্র ২.২ জন, সেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ জনে।

 

ই-জিপি নিবন্ধনের জোয়ার:
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর দৈনিক ই-জিপি নিবন্ধনের আবেদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি আবেদন জমা পড়ত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টিতে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তারাও এখন সরকারি ক্রয়ে ক্রমবর্ধমান হারে অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে ই-জিপি সিস্টেমে ৭ হাজার ৪০৮ জন নারী দরদাতা নিবন্ধিত রয়েছেন, যার মধ্যে পিপিআর, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭ জন।

 

মূল্যের যৌক্তিকতা বৃদ্ধি:
নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কাজের ক্রয়ের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের সাথে দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্যের গড় পার্থক্যের হার ঋণাত্মক ১০ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মূল্যের এই উন্নতি অস্বাভাবিক কম মূল্যে দরপত্র দাখিলের আশঙ্কা বা উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করেছে।

‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫’ এ ১৫৪টি বিধি এবং ২১টি তফসিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজের পরিবর্তে কৌশলগত সুশাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সংস্কারগুলো হলো: জাতীয় কাজের ক্রয়ে ১০ শতাংশ মূল্যসীমা বাতিল করে বাজারভিত্তিক মূল্য নিশ্চিতকরণ; সব ধরনের সরকারি ক্রয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ই-জিপি ব্যবহার; চুক্তি সম্পাদনকারী বা কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশ; টেকসই সরকারি ক্রয় (এসপিপি) প্রবর্তন; ক্রয় কৌশল ও প্রাথমিক বাজার সম্পৃক্ততা; ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি ও দর-কষাকষি প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ; নারী, ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালন ক্রয় বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ; প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ‘ক্রয় ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা এবং ভৌত সেবাকে ক্রয়ের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

 

ই-জিপির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি
২০১১ সালে দেশে ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সরকারি ক্রয়ে অভূতপূর্ব দক্ষতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়ের গড় সময়সীমা কমে ৫৪ দিনে নেমে এসেছে। মূল দরপত্রের বৈধতার মেয়াদের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি এবং কার্যাদেশ বা চুক্তি অনুমোদনের তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। এই অর্জনগুলো দেশের ক্রয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ
ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও দরদাতাদের দক্ষতার অভাব, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক দুর্বলতা এবং আচরণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত যোগাযোগ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

 

আগামীর পথচলা
বিপিপিএ’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, নীতি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্রয় ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি) জাতীয় পর্যায়ে ক্রয় প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সার্বিকভাবে যেভাবে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থায় রূপান্তর হচ্ছে, তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক সংস্কার।

বিপিপিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শতভাগ ই-জিপি বাধ্যতামূলক এবং সম্পূর্ণ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে ডিজিটাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রূপান্তরের অন্যতম অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি ক্রয় সংস্কারের বিভিন্ন অর্জন টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের আগে তাদের জন্য ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

 

বিপিপিএ সিইও আরও জানান, প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি)-কে ভবিষ্যতে একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি ক্রয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত সকল অংশীজনদের সমন্বিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের অভিযানে চাপাতিসহ ছিনতাইকারী গ্রেফতার

সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ

আপডেট সময় ৬ ঘন্টা আগে

আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ রূপান্তরের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি ক্রয়ে কোনো ধরনের অফলাইন বা ম্যানুয়াল (কাগজে-কলমে) দরপত্র আহ্বান করা যাবে না। দেশের ক্রয় খাত সংস্কারের যাত্রায় এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়া ১ জুলাই, ২০২৬ এর আগে ম্যানুয়ালি শুরু হলে সেই প্রক্রিয়ার বাকি ধাপগুলো ম্যানুয়ালি চলতে পারে। তবে ওই তারিখের পর নতুন কোনো অফলাইন টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুমোদিত হবে না। ই-জিপি ব্যবহার থেকে অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদনও ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পর আর অনুমোদিত হবে না।

 

তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

 

সরকারি ক্রয়: একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সুশাসনে সরকারি ক্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ সরকারি ক্রয়ে ব্যয় হয়। তাই জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং সেবা প্রদানের মান বাড়াতে এই খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।

ক্রয় ব্যবস্থাপনা জোরদার করার লক্ষ্যে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে, যা ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। পরে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হয়। এর পাশাপাশি, পিপিআর-২০০৮-এর পরিবর্তে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ক্রয় ব্যবস্থায় একটি ব্যাপক সংস্কার হয়েছে।

 

ই-জিপি: ক্রয় খাত সংস্কারের মেরুদণ্ড
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের অধীনে সবচেয়ে যুগান্তকারী সংস্কারগুলোর অন্যতম হলো সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রমে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত এই ই-জিপি ব্যবস্থা দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে চুক্তি সম্পাদন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া—অর্থাৎ সম্পূর্ণ ক্রয় চক্রকে ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে ইতোমধ্যে ক্রয় ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাধ্যতামূলক ই-জিপি বাস্তবায়নের এই পদক্ষেপের ফলে ম্যানুয়াল বা সনাতন পদ্ধতির দরপত্রের সাথে জড়িত দীর্ঘদিনের বহু সমস্যা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কাজের দীর্ঘসূত্রতা, স্বচ্ছতার অভাব, মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের সুযোগ।

 

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সংস্কারের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

 

প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি:
দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের গড় সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিআর, ২০২৫ বাস্তবায়নের আগে যেখানে দরপত্র প্রতি গড় দরদাতার সংখ্যা ছিল মাত্র ২.২ জন, সেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ জনে।

 

ই-জিপি নিবন্ধনের জোয়ার:
নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর দৈনিক ই-জিপি নিবন্ধনের আবেদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি আবেদন জমা পড়ত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টিতে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তারাও এখন সরকারি ক্রয়ে ক্রমবর্ধমান হারে অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে ই-জিপি সিস্টেমে ৭ হাজার ৪০৮ জন নারী দরদাতা নিবন্ধিত রয়েছেন, যার মধ্যে পিপিআর, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭ জন।

 

মূল্যের যৌক্তিকতা বৃদ্ধি:
নির্মাণ বা উন্নয়নমূলক কাজের ক্রয়ের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের সাথে দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্যের গড় পার্থক্যের হার ঋণাত্মক ১০ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মূল্যের এই উন্নতি অস্বাভাবিক কম মূল্যে দরপত্র দাখিলের আশঙ্কা বা উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করেছে।

‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫’ এ ১৫৪টি বিধি এবং ২১টি তফসিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজের পরিবর্তে কৌশলগত সুশাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সংস্কারগুলো হলো: জাতীয় কাজের ক্রয়ে ১০ শতাংশ মূল্যসীমা বাতিল করে বাজারভিত্তিক মূল্য নিশ্চিতকরণ; সব ধরনের সরকারি ক্রয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ই-জিপি ব্যবহার; চুক্তি সম্পাদনকারী বা কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার তথ্য প্রকাশ; টেকসই সরকারি ক্রয় (এসপিপি) প্রবর্তন; ক্রয় কৌশল ও প্রাথমিক বাজার সম্পৃক্ততা; ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি ও দর-কষাকষি প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ; নারী, ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালন ক্রয় বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ; প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ‘ক্রয় ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা এবং ভৌত সেবাকে ক্রয়ের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

 

ই-জিপির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি
২০১১ সালে দেশে ই-জিপি ব্যবস্থা চালুর পর থেকে সরকারি ক্রয়ে অভূতপূর্ব দক্ষতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়ের গড় সময়সীমা কমে ৫৪ দিনে নেমে এসেছে। মূল দরপত্রের বৈধতার মেয়াদের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি এবং কার্যাদেশ বা চুক্তি অনুমোদনের তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। এই অর্জনগুলো দেশের ক্রয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ
ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও দরদাতাদের দক্ষতার অভাব, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক দুর্বলতা এবং আচরণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া টেকসই করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত যোগাযোগ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

 

আগামীর পথচলা
বিপিপিএ’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, নীতি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ক্রয় ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি) জাতীয় পর্যায়ে ক্রয় প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সার্বিকভাবে যেভাবে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থায় রূপান্তর হচ্ছে, তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই নয়, বরং স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক সংস্কার।

বিপিপিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শতভাগ ই-জিপি বাধ্যতামূলক এবং সম্পূর্ণ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে ডিজিটাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রূপান্তরের অন্যতম অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি ক্রয় সংস্কারের বিভিন্ন অর্জন টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের আগে তাদের জন্য ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

 

বিপিপিএ সিইও আরও জানান, প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি)-কে ভবিষ্যতে একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেখানে সরকারি ক্রয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত সকল অংশীজনদের সমন্বিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।