ঢাকা , মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ভোক্তাদের স্বস্তি, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হ্রাস Logo তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ, উদ্বিগ্ন ব্যাংকিং খাত Logo দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নেই আগামী বাজেটের প্রধান গুরুত্ব: অর্থমন্ত্রী Logo কোস্ট গার্ডের অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে ১৪শ’ লিটার জ্বালানি তেল আটক Logo চলতি বছরেও সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কা Logo ফরিদপুরে ডিবি পুলিশের অভিযান: হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারি আটক Logo সিলেটে পুলিশের অভিযানে এক মাসে ১৬৬৫ জন গ্রেফতার Logo তোফায়েল আহমেদের মরদেহ ভোলায় পৌঁছেছে, হাজারো মানুষের শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় Logo সিলেটে হাম উপসর্গে এবার নার্সের মৃত্যু : হাসপাতালে ভর্তি ৭৮ জন Logo ভাঙ্গায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় নিহত ৫
নোটিশ :
বাংলা 21 সংবাদ পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়ে আপনিও আপনার মতামত, পরামর্শ অথবা অভিযোগ আমাদের জানাতে পারেন।

তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ, উদ্বিগ্ন ব্যাংকিং খাত

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আবারও বেড়ে নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এতে মার্চ ২০২৬ শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে ঋণ বাড়লেও তার মান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে, আর পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে খেলাপি ঋণের চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। তিন মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে প্রতি তিন টাকার মধ্যে এক টাকার বেশি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায় প্রত্যাশিত হারে হচ্ছে না। একই সঙ্গে আগের ঋণের সুদ যোগ হয়ে মোট পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এবং নীতি সহায়তার আওতায় যেসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখনো আদায় পর্যায়ে আসেনি।

প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে। বেসরকারি ব্যাংকেও এই হার বেড়ে ৩০ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা সামগ্রিক খাতের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের বড় অংশই এখন ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ শ্রেণিতে পড়েছে, যার অর্থ এসব ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বা স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টও দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রভিশন ঘাটতিও এখন ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে এবং মূলধন সংকট তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, এক বছরে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঋণের গুণগত মান উন্নত হয়নি, বরং ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি করছে। নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে যাওয়া এবং ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এখন আরও প্রকট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অতীতে বিভিন্ন পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার কারণে কিছু খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কম দেখালেও তা টেকসই সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ আবার ফিরে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। না হলে আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতের এই সংকট আরও গভীর হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোক্তাদের স্বস্তি, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হ্রাস

তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ, উদ্বিগ্ন ব্যাংকিং খাত

আপডেট সময় ৩ ঘন্টা আগে

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আবারও বেড়ে নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এতে মার্চ ২০২৬ শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে ঋণ বাড়লেও তার মান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে, আর পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে খেলাপি ঋণের চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। তিন মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে প্রতি তিন টাকার মধ্যে এক টাকার বেশি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায় প্রত্যাশিত হারে হচ্ছে না। একই সঙ্গে আগের ঋণের সুদ যোগ হয়ে মোট পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এবং নীতি সহায়তার আওতায় যেসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখনো আদায় পর্যায়ে আসেনি।

প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে। বেসরকারি ব্যাংকেও এই হার বেড়ে ৩০ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা সামগ্রিক খাতের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের বড় অংশই এখন ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ শ্রেণিতে পড়েছে, যার অর্থ এসব ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বা স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টও দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রভিশন ঘাটতিও এখন ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে এবং মূলধন সংকট তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, এক বছরে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঋণের গুণগত মান উন্নত হয়নি, বরং ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি শুধু ব্যাংক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য চাপ তৈরি করছে। নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে যাওয়া এবং ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এখন আরও প্রকট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অতীতে বিভিন্ন পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার কারণে কিছু খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কম দেখালেও তা টেকসই সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ আবার ফিরে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। না হলে আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতের এই সংকট আরও গভীর হবে।